বুধবার ৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

টেকনাফে চাঁদা না পেয়ে স্কুল পড়োয়া মেয়ের জমি দখলের চেষ্টা, থানায় অভিযোগ

জয়নাল আবেদিন - টেকনাফ   |   বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   83 বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

টেকনাফে চাঁদা না পেয়ে স্কুল পড়োয়া মেয়ের জমি দখলের চেষ্টা, থানায় অভিযোগ

কক্সবাজারের টেকনাফে চাঁদা না পেয়ে এক স্কুল পড়োয়া মেয়ের মালিকানাধীন জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মহিমা শবনম মনি (১৮)-এর মা বাদী হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

গত বুধবার (৪ মার্চ) দুপুর আড়াইটার দিকে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের উত্তর লম্বরী এলাকায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জোরপূর্বক জমি দখলের চেষ্টা চালায়। স্থানীয়দের উপস্থিতিতে অভিযুক্তরা জমি দখল করতে না পারলেও ৭ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে হুমকি দেন। এরপর, ওইদিন রাত ১১ টার দিকে ভুক্তভোগীর মা মনোয়ারা বেগম (৩৮) বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযুক্তরা হলেন, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের দরগারছড়া এলাকার বাসিন্দা মৃত সৈয়দ হোসনের পুত্র সাইফুল ইসলাম সাইফী (৪৮) উত্তর লম্বরীর বাসিন্দা মৃত মকতুল হোসনের পুত্র জাফর আহমদ (৫০), হাতিয়ার ঘোনার বাসিন্দা মৃত নুর আহমদের পুত্র ইউনুস (৪০) ও একই এলাকার কবির আহমদের পুত্র আবদুর রহমান (৩০) সহ অজ্ঞাতনামা আরো ৭/৮ জন রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, ভুক্তভোগী নারীর মেয়ের নামে নিবন্ধিত একটি জমি দীর্ঘদিন ধরে তাদের দখলে থাকলেও স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি যোগসাজশে জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। এ নিয়ে একাধিকবার সালিশ বৈঠক হলেও অভিযুক্তরা সমাধান মেনে নেয়নি। গত ৪ মার্চ দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে জমিতে গিয়ে দখলের চেষ্টা করে। বাধা দিতে গেলে ভুক্তভোগী নারীকে গালিগালাজ ও মারধরের হুমকি দেওয়া হয়। তার চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা সরে যায়। এ সময় জমি ভোগদখলে রাখতে নগদ ৭ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এই ভুক্তভোগী।

অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম সাইফী বলেন, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের উত্তর লম্বরীতে অবস্থিত ইসলামিক গণ পাঠাগারের জমি থেকে কিছু মানুষ গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে দেখে আমি বাঁধা দিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছি। এই পাঠাগার দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে রয়েছে। আমি সাংবাদিক হিসেবে ভিডিও করার সময় আমার মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়।

এদিকে, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের হাতিয়ার ঘোনা এলাকার জমির মালিক অলী আহমদ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে তার স্ত্রী জাবেদা খাতুন ও বোনরা ওয়ারিশ হন। পরবর্তীতে, গত বছরের ১৩ আগস্ট তারা জমিটি উত্তর লম্বরী এলাকার মহিমা শবনম মনির কাছে বিক্রি করেন। অলি আহমদের পালিত মেয়ে মোমেনা খাতুন ভূয়া দলিল দেখিয়ে বর্তমান মালিকদের হয়রানি করছেন। আলী আহমদ জীবদ্দশায় সেখানে একটি ইসলামিক গণপাঠাগার প্রতিষ্ঠা করলেও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আর সংস্কার হয়নি। এরপর থেকে প্রায় ৩০ বছর জমিটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

এ বিষয়ে ইসলামিক পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক মাওলানা তৈয়বুর রহমান জানান, ১৯৮৫ সালে আমার মামা হাজ্বী অলি আহমদ আব্দুল হককে সভাপতি ও আমাকে সেক্রেটারি করে পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। জমিটি তখন থেকে আমাদের তত্ত্বাবধানে ছিল। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে পাঠাগারটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আর সংস্কার করা হয়নি। তবে জমিটি পাঠাগারের নামে লিখিতভাবে দান করা হয়নি। অলী আহমদের মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশরা জমিটি অলি আহমদের ভাগ্নি শবনম মনির কাছে বিক্রি করেছেন। যা আমি নিজেও অবগত আছি।

জমি বিক্রির সত্যতা নিশ্চিত করে মরহুম অলী আহমদের বোনের ছেলে নুর আহাম্মদ জানান, আমার নানা মরহুম অলী আহমদের রেখে যাওয়া জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আমরা। জমিটির আরএস, বিএস ও বন্দোবস্ত আমার দাদার নামেই ছিল। আমার মা ও ফুফিসহ আমরা জমিটি শবনমের কাছে বিক্রি করেছি এবং সেখানে আমি নিজেও স্বাক্ষর করেছি। যারা পাঠাগারের কথা বলছেন, তাদের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো বৈধ দলিল-প্রমাণ নেই। আমি প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বর্তমান মালিকদের হয়রানি থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

অপরদিকে, মরহুম অলি আহমদের পালিত মেয়ে মোমেনা খাতুন নিজেকে ওয়ারিশ দাবি করে একটি ভূয়া দলিল দাখিল করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করেন। পরবর্তীতে উভয় পক্ষের দাখিলকৃত কাগজপত্র পর্যালোচনা শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বর্তমান জমির মালিক শবনমের পক্ষে ডিগ্রি প্রদান করেন।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় ইউপি সদস্য জালাল আহমদ বলেন, মরহুম অলি আহমদের উত্তরাধিকারী থেকে ক্রয়কৃত জমি বিক্রির পর মোমেনা খাতুন নিজেকে প্রকৃত ওয়ারিশ দাবি করে সহকারী কমিশনার বরাবর আপত্তি জানায়। আমার উপস্থিতিতে পরে দুই পক্ষকে ডেকে যাচাই-বাছাই করে তদন্তের পর শবনমের পক্ষে সুপারিশ করে, যার ভিত্তিতে জমির ডিগ্রি দেওয়া হয়। বর্তমানে সাইফির নেতৃত্বে একটি দল ওই জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করছে। এই জমি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় সেখানে মাদক সেবন চলছিল। অলি আহমদ সৌদি আরব থেকে ফিরে মাদকসেবীদের তাড়িয়ে সেখানে নতুন ঘর নির্মাণের জন্য জমি পরিষ্কার করেছিলেন।

উত্তর লম্বরী এলাকার অলি আহমদ তার বিধবা বোন মনোয়ারা বেগমের স্কুল পড়োয়া দশম শ্রেণির মেয়ে মহিমা শবনম মনির নামে এই জমি ক্রয় করেছেন। অলি আহমদ জানান, গত বছরের ১৩ আগস্ট দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকা জমি ক্রয় করে আমার বিধবা বোনের স্কুল পড়ুয়া মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তার জন্য ক্রয় করেছি। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও বিষয়টি জানেন। আমি সৌদি আরব থেকে ফিরে সাইফি নামের এক ব্যক্তি আমাকে হুমকি দিয়ে ৭ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় তিনি জোরপূর্বক জমি দখলের চেষ্টা করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা সংবাদ ছড়াচ্ছেন। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ঠদের কাছে ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করছি।

তার আপন ভাই দেলোয়ার হোসেন বলেন, একসময় এ জমিতে পাঠাগার ছিল। ওয়ারিশগণ জমি আমাদেরকে বিক্রি করেছেন। মোমেনা খাতুন নিজেকে ওয়ারিশ দাবি করে এসিল্যান্ডের কাছে যায়। দুই পক্ষের দলিল দেখে ইউনিয়ন পরিষদ তদন্তের পর আমাদের পক্ষে রায় দেয়। হঠাৎ সাইফির নেতৃত্বে একদল লোক জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করলে আমরা স্থানীয় সহায়তায় তা প্রতিহত করি। আগেও তারা ৭ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। এখন সাইফি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে, আমরা ন্যায় বিচার চাই।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, টেকনাফ সদরের উত্তর লম্বরী এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে সামান্য বিরোধের ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এ ঘটনায় থানায় উভয় পক্ষের পক্ষ থেকে পৃথক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

Facebook Comments Box

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

প্রকাশক ও সম্পাদক
তাহা ইয়াহিয়া
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
বিজয় কুমার ধর

যোগাযোগ

প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত

মোবাইল : বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন : 01828090145, 01812586237

ই-মেইল: ajkerdeshbidesh@yahoo.com