রফিক মাহমুদ, কক্সবাজার: | রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | 121 বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
কক্সবাজার জেলায় পৃথক চারটি ঘটনায় চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার (৭ মার্চ) দিনভর জেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে জেলা সদর হাসপাতালে লিফটের নিচে চারদিন পর এক নিখোঁজ নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়রা একদিনে চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়
আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন।
হাসপাতালের লিফটের নিচে নিখোঁজ নারীর মরদেহ
কক্সবাজারের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের লিফটের নিচ থেকে চারদিন পর উখিয়ার এক নিখোঁজ নারীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার মরদেহটি উদ্ধার করলে হাসপাতালজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
নিহত কোহিনুর আক্তার (৩২) উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ডেইলপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং কাতার প্রবাসী নুরুল ইসলামের স্ত্রী।
স্বজনরা জানান, গত বুধবার (৩ মার্চ) নিজের সাত বছর বয়সী মেয়েকে চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করান কোহিনুর। ওই দিন বিকেল থেকে তিনি নিখোঁজ হন। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
নিহতের স্বামীর ভাতিজা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমার চাচিকে চারদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেছি এবং র্যাব ও পুলিশকেও জানিয়েছি। আজ হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় নিখোঁজ হওয়ার দিন তিনি চারতলার লিফটে প্রবেশ করেছিলেন, কিন্তু এরপর আর বের হতে দেখা যায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “লিফটে দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে তার মৃত্যু হয়েছে—তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানাচ্ছি।”
হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। চিকিৎসা নিতে আসা খরুলিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, “চারদিন ধরে একটি মরদেহ লিফটের নিচে পড়ে থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছুই জানেনি—এটি চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়। বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিংঞোর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছমি উদ্দিন বলেন, “ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ইজিবাইক চালকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
কক্সবাজার শহরের দক্ষিণ কলাতলী এলাকায় গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় কায়সার (৩০) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার সকালে স্থানীয়দের খবরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে।
কায়সারের বাবার নাম মোহাম্মদ সিরাজ। তার বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার সাতবারিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মোজাহের পাড়ায়। জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কলাতলীর একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন। পেশায় তিনি একজন ইজিবাইক চালক ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট ও ধার-দেনার চাপ নিয়ে তার সংসারে অশান্তি চলছিল।
নিহতের স্ত্রী বলেন,“সেহরির সময় ধার-দেনা নিয়ে আমাদের কথা কাটাকাটি হয়। তিনি আমাকে বাপের বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে বলেন। আমি মাকে ডাকতে বাইরে গেলে ফিরে এসে দেখি ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি তিনি ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে আছেন।”
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি ছমি উদ্দিন বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে।”
চাঁদা না দেওয়ায় হিন্দু যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা
কক্সবাজার পৌরসভার বিজিবি ক্যাম্প পল্লানকাটা এলাকায় চাঁদা না দেওয়ায় গণেশ পাল (৩৮) নামে এক হিন্দু যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত গণেশ পাল ওই এলাকার বিশ্বনাথ পালের ছেলে এবং কক্সবাজার বড়বাজারের একজন মুদির দোকানদার ছিলেন।
নিহতের স্ত্রী শেফালি পাল ও ভাই আশীষ পাল জানান, “বাড়িতে সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ করতে গেলে স্থানীয় জিসান নামের এক ব্যক্তি চাঁদা দাবি করেন। এ নিয়ে কয়েকবার কথাকাটাকাটি হয়। শনিবার দুপুরে অতর্কিতভাবে গণেশকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে জিসান।”
পরে গুরুতর আহত অবস্থায় গণেশকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ওসি ছমি উদ্দিন বলেন, “নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চাঁদা দাবির বিষয়টি শোনা যাচ্ছে। তদন্ত করে বিস্তারিত জানা যাবে এবং জড়িতদের আটক করতে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।”
উখিয়ায় স্বামীর লাথিতে স্ত্রীর মৃত্যু, স্বামী পলাতক
এদিকে উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের বাদামতলী এলাকায় স্বামীর লাথিতে আনোয়ারা বেগম নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। শনিবার বিকেল ৫টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আনোয়ারা বেগম পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী হাকিমপাড়া এলাকার আব্দুমজিদের মেয়ে। তার স্বামী আব্দুজলিল জালিয়াপালং ইউনিয়নের বাদামতলী এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পারিবারিক কলহের জেরে স্বামী আব্দুজলিল স্ত্রীকে লাথি মারলে গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর থেকেই স্বামী পলাতক রয়েছে।
নিহত দম্পতির দুই ছেলে রয়েছে। তাদের মধ্যে বড় ছেলের বয়স ৮ বছর এবং ছোট ছেলের বয়স ৫ বছর।
উখিয়া থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)
নুর আহমদ জানান, স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। নিহত নারীর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান পরিচালনা করছে।