| বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | 4 বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় আলোড়ন তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। অভিযুক্ত জাকির ও এ কাজে সহায়তাকারী তার স্ত্রী স্বপ্না গ্রেপ্তার হলেও জনমনে সংশয় রয়েছে আদৌ কী তারা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে? আর পেলেও সেটা কতদিনের মধ্যে? এই সংশয়ের কারণও রয়েছে। এর আগে বহুল আলোচিত বিভিন্ন ধর্ষণ বা ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মামলা দীর্ঘদিন চলমান থেকেছে। কোনো কোনো মামলার রায় হয়েছে বহু বছর পর, আবার কোনো মামলার রায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি হলেও রায় কার্যকর আটকে আছে।
এমন পরিস্থিতিতে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা সংক্রান্ত অপরাধের রায় নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে দেশজুড়ে। বিশেষ করে তদন্ত, মামলার শুনানি এবং রায় কার্যকরে দীর্ঘসূত্রিতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ সংক্রান্ত অপরাধের বিচারে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল পাকিস্তানের ইমরান খান সরকার। ধর্ষকের শাস্তির বিধান এমন কঠোর রেখে বিল পাস হয়েছিল যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য কোনো দেশে নেই। তবে শেষ পর্যন্ত সেই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে পারেননি ইমরান খান।
কী ছিল পাকিস্তানের ধর্ষণের বিচার সংক্রান্ত বিধানে
২০২০ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাসায়নিক দিয়ে ধর্ষকের লিঙ্গচ্ছেদ করার শাস্তি রেখে তৈরি নতুন এক আইনের প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আরিফ আলভি। বিশেষ করে ধর্ষকের লিঙ্গচ্ছেদ এবং প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড রাখার বিষয়টি প্রস্তাব করেছিলেন ইমরান খান। সেই অনুযায়ী নভেম্বরে ‘অ্যান্টি রেপ অর্ডিন্যান্স’ অধ্যাদেশটি অনুমোদন দেয় দেশটির মন্ত্রিসভা এবং ডিসেম্বরে এতে সই করেন রাষ্ট্রপতি।
এতে ন্যাশনাল ডাটাবেজ অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অথরিটির (এনএডিআরএ) মাধ্যমে যৌন নিপীড়কদের তালিকা তৈরি করা, যৌন অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীদের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ধর্ষণের মামলা বিশেষ দ্রুত বিচার আদালতে চারমাসের (১২০ দিন) মধ্যে রায় দেয়ার বিধানও রাখা হয়।
লাহোর শহরের উপকণ্ঠে শিশু সন্তানের সামনে এক নারীকে গণধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হলে জনরোষ তৈরি হওয়াকে কেন্দ্র করে প্রণীত হয় নতুন আইনটি। একটি মহাসড়কের পাশে দুই সন্তানের সামনে ঐ নারী নির্যাতনের শিকার হন। ঘটনার পরদিন ধর্ষণের জন্য ঐ নারীও আংশিকভাবে দায়ী ছিলেন বলে লাহোরের পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যের পর বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে। এর পেক্ষাপটেই ইমরান খান ধর্ষণের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ও দ্রুত বিচার সম্পাদনের প্রতিশ্রুতি দেন।
বিলে ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত অপরাধী প্রথমবার হোক বা বারবার, এমন অপরাধে যুক্ত হলেই তার যৌনাঙ্গ কেটে দেয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে অ্যান্টি রেপ ক্রাইসিস সেল গঠন, রেপ হওয়া নারীদের পরিচিতি গোপন রাখা এবং পরিচয় গোপন না রাখা হলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষিত হবে- এমন বিধানও রাখা হয়।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানে ধর্ষণ বিরোধী বিক্ষোভ।
বিলে বলা হয়, মামলার তদন্ত করতে যে পুলিশ কর্মকর্তা ও সরকারি অফিসাররা গাফিলতি করবে তাদের জরিমানা, এমনকি তিন বছর অবধি জেলও হতে পারে। মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করবে এমন পুলিশ কর্মকর্তা ও সরকারি অফিসারদেরও সাজা দেয়া হবে। ইমরান খান জানিয়েছিলেন, একটি বিশেষ ফান্ড তৈরি করে স্পেশাল কোর্ট তৈরি করা হবে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার এতে যোগদান করবে। এই তদন্তের কাজে স্থানীয়, রাজ্য, কেন্দ্র এমনকি আন্তর্জাতিক এজেন্সির সহযোগিতাও নেয়া হবে।
যে কারণে কঠোর শাস্তির বিধান বাস্তবায়ন হয়নি
মানবাধিকার কর্মী আর মুসলিম স্কলারদের ব্যাপক সমালোচনা ও চাপ প্রয়োগের কারণে কঠোর শাস্তির বিধান বাস্তবায়ন করতে পারেননি ইমরান খান। ২০২১ সালের নভেম্বরে বিলের প্রস্তাবনাটি যখন পাকিস্তানের পার্লামেন্টে উত্থাপন পূর্বক পাশ হয়ে আইনে পরিণত হয়, তখন লিঙ্গচ্ছেদ ও প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাদ দেয়া হয়।
এছাড়া বেশ কিছু বিষয়ে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। তবে, দ্রুত বিচারের বিধানটি অপরিবর্তিত ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত আইনটিতে। সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড এবং বিশেষ ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড রাখা হয় পাকিস্তানের ‘অ্যান্টি রেপ অ্যাক্ট-২০২১’ আইনে।
এ বিষয়ে বিবিসি উর্দুর সাংবাদিক জুবায়ের আজম বলেছিলেন, পাকিস্তানের ইসলামিক মতাদর্শিক কাউন্সিল মত দিয়েছে, রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে ধর্ষকদের খোজা করার বিষয়টি ইসলাম-সম্মত নয়। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে আইন বিষয়ক সচিব মালিকা বুখারিও ওই সময় বলেছিলেন, ইসলামিক মতাদর্শিক কাউন্সিলের আপত্তি পর্যালোচনা করে বিষয়টি বাদ দেয়া হয়েছে।
জানা যায়, রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে খোজা করে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও আপত্তি তুলেছিল। বিশেষ করে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ ধরনের সাজার পরিবর্তে ধর্ষণের কারণ খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছিল।
পাকিস্তানের পার্লামেন্ট।
যদিও পুরুষাঙ্গ কর্তনের বিধান বেশ কিছু দেশে রয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, ইন্দোনেশিয়া, পোল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, চেক রিপাবলিক এবং আমেরিকার কিছু রাজ্যের আইনে এমন বিধান রয়েছে।
ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচারে বাংলাদেশের আইনে যা রয়েছে
বাংলাদেশেও ধর্ষণের জন্য আলাদা আইন না থাকলেও ‘নারী ও শিশু নির্যাতন আইন-২০০০’-এর মধ্যেই ধর্ষণ বিষয়ক অপরাধের বিধান রাখা হয়েছে। আইনটির ৯ (১) ধারায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ১৮ (১)-এর ‘ক’ ধারায় ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা বলা হয়েছে। তবে শর্তসাপেক্ষে এই সময় বাড়ানোর বিধানও রয়েছে। পাশাপাশি বিচারের জন্য মামলা প্রাপ্তির তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বিচারকার্য সমাপ্তের বিধান রয়েছে আইনে।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে ১৫ দিন এবং বিচারকার্যে ৯০ দিন নির্ধারণ করে অধ্যাদেশ জারি করে। তবে সেটি এখনও আইনে পরিণত হয়নি। যদিও বলবৎ নারী ও শিশু নির্যাতন আইন-২০০০ এ উল্লেখিত সময়ের মধ্যেও অধিকাংশ ধর্ষণ মামলার বিচার শেষ হয় না বাংলাদেশে। বিশেষ করে প্রথমবার রায় হলেও, আপিলের পর নতুন করে শুনানি ও পুনরায় রায়ে অনেক সময় লেগে যায়, আর রায় কার্যকর পর্যন্ত আরেক দফা সময়ক্ষেপণ লক্ষ্য করা যায়।
সম্প্রতি সময়ে বহুল আলোচিত একটি ঘটনা ছিল মাগুরার আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ রাতে ধর্ষণ-হত্যার শিকার হয় আট বছরের শিশুটি। দেশজুড়ে আলোচিত সেই ঘটনার পর অচেতন আছিয়াকে ঢাকা আনা হয় উন্নত চিকিৎসার জন্য। এর আট দিনের মাথায় সারা দেশকে কাঁদিয়ে ঢাকার সিএমএইচে মারা যায় আছিয়া।
শিশু আছিয়ার মৃত্যুর পর উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। তোপের মুখে ওই নারী নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন এনে দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমাপূর্বক মামলার শুনানি ও সর্বশেষ রায়ও হয়। কিন্তু অগ্রগতি থেমে যায় আপিলের পর।
ধর্ষণ সংক্রান্ত ঘটনায় দেশের ইতিহাসে সব থেকে আলোচিত ছিল ১৮ বছর আগে সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান ওরফে রসু খার মামলা। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তিনি একে একে ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছিল। ১১ বছর আগে চাঁদপুরে এক পোশাকশ্রমিককে হত্যার দায়ে রসু খাঁর ফাঁসির আদেশও দেন আদালত। এই মৃত্যুদণ্ডাদেশ হাইকোর্টও বহাল রাখে। তবে ফাঁসির সেই আদেশ কার্যকর হয়নি এখনও। রসু খাঁ এখন আছেন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল ১০১টি হত্যাকাণ্ড ঘটানো।
২০২২ সালের চাঁদপুরের আদালতে হাজির করা হয় ‘রসু খা’কে।
যা বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ
দীর্ঘদিন ধরে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে গবেষণা করে আসছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. নুরজাহান খাতুন। তিনি চ্যানেল 24 অনলাইনকে বলেন, অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে কঠোরতার চেয়ে দ্রুত শাস্তির নিশ্চয়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তি যদি এমন অনুভব করে যে, এই অপরাধ করলে নিশ্চিত এবং দ্রুত শাস্তি তাকে পেতে হবে, তাহলে অপরাধ কমবে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনার মামলায় ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার হারও অনেক কম বলে জানান তিনি। আর এজন্য বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা, সামাজিক সচেতনতায় দুর্বলতা, তথ্য উপস্থাপনে ঘাটতিকে দায়ী করেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, বিচার কার্য সঠিক সময়ে সম্পাদন আর আইন অনুযায়ী যে সাজা ধার্য রয়েছে, তা কম সময়ের মধ্যে কার্যকর করলে সংকট সমাধান সম্ভব, এটি সিভিয়ার শাস্তির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।