জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ | শুক্রবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট | 197 বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিনড্রাইভ দিয়ে আসা যাওয়ার পথে ভ্রমণ পিয়াসী যে কারো চোখে পড়ে দৃষ্টি নন্দন কচ্ছপিয়া পাহাড়টি। টেকনাফের বাহারছড়ায় অবস্থান এটির। বৈকালিক ডুবন্ত সূর্যের আলোক রশ্মি পাহাড় পড়তেই সৌন্দর্য্যরে এক মায়াবী রূপ ধারণ করে এ পাহাড়। প্রকৃতির অনিন্দ্য এ সুন্দর দৃশ্যটি ধারণ করতে অনেকে গাড়ি থামিয়ে পাহাড়কে পেছনে রেখে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু রূপময় মায়াবী এ পাহাড়ের অন্তরালে যে মানুষরুপী রাক্ষুসের থাবা বসেছে তা কে জানে ?
সম্প্রতি একাধিক আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পৃথক ও যৌথ অভিযানে পাহাড়ের ভৌতিক রহস্য উদঘাটন হয়েছে। ভূতেরা মানুষ ধরে জঙ্গলে লুকিয়ে রাখার রূপকথার গল্পের মতো বাস্তবেও এ পাহাড়ে এমন ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। মালয়েশিয়া মানবপাচারের জন্য লোকজনকে ধরে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া পাহাড়ে পাচারকারীদের গোপন আস্তানায় রাখা হচ্ছে। পাচারকারীদের এই অপারেশনে পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও শিশুরাও বাদ যায়না। এ পাহাড়ের বন্দীশালায় দিনের পর দিন কাটাতে হয় ভুক্তভোগীদের।
গত দুই সপ্তাহে বিজিবি, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও র্যাব পৃথক ও যৌথ অভিযান চালিয়ে শুধু এ পাহাড় থেকেই ১৭২ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে। যাদের নৌপথে মালয়েশিয়া পাচারের উদ্দেশ্যে সেখানে নিয়ে জড়ো করা হয়েছিল। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের যৌথ দল কচ্ছপিয়া পাহাড়ের খুব কাছেই করাচি পাড়া একটি বাড়ি থেকে ২১ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে। পাচারকারীরা ওই ২১ জনকে কচ্ছপিয়া পাহাড়ের বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়ার আগেই খবর পেয়ে যৌথবাহিনী অভিযানে যায়। এর আগে বিজিবি ও র্যাব যৌথ অভিযানে এ পাহাড় থেকে ৮৪ জনকে উদ্ধার করেছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে কোস্ট গার্ড ৬৬ জনকে উদ্ধার করেছে। এ একটি মাত্র পাহাড় থেকে এ নিয়ে গত দুই সপ্তাহে ১৯৩ জন পাচারের শিকার ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ঘটনায় পাচারচক্রের বেশ কয়েকজন সদস্য আটক হলেও মুল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।কোস্টগার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সিয়াম-উল-হক জানান, নৌ পথে মালয়েশিয়া পাচারের উদ্দেশ্যে নারী ও শিশুসহ বেশ কিছু ব্যক্তিকে টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়ার কাছাকাছি করাচি পাড়া ঘাট সংলগ্ন একটি ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। গত বুধবার রাত ১১ টায় কোস্ট গার্ড এবং নৌবাহিনীর একটি যৌথ দল সেখানে অভিযান পরিচালনা করে পাচারের উদ্দেশ্যে বন্দি থাকা নারী ও শিশুসহ ২১ জন ব্যক্তিকে উদ্ধার করে। অভিযান চলাকালীন যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তাদের আটকের নিমিত্তে নৌ বাহিনী ও কোস্ট গার্ডের গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান চলমান রয়েছে।
কচ্ছপিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা মো. আমিন বলেন, সংঘবদ্ধ পাচারকারী দল কচ্ছপিয়া এলাকার সুনামটিও নষ্ট করেছে। পাহাড়ে পাচারকারী চক্রের একাধিক আস্তানা রয়েছে। চিরুনী অভিযান পরিচালনা করলে সেখানে আরও ভুক্তভূগী উদ্ধার করা সম্ভব হবে। আমাদের প্রশ্ন, প্রশাসনের অভিযানে এতো উদ্ধার ও আটকের পরও এই কচ্ছপিয়া পাহাড়ে আবারো কিভাবে পাচারের জন্য লোক জড়ো করে পাচারকারীরা। তাহলে বুঝতে অসুবিধা নেই যে, পাচারকারীরা অত্যন্ত শক্তিশালী ও কৌশলী। মুলত তারাই কচ্ছপিয়া পাহাড়কে মানবপাচারের হটস্পটে পরিণত করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেয়া তথ্য, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তালিকা ও অনুসন্ধানে কচ্ছপিয়া পাহাড় কেন্দ্রিক শক্তিশালী মানবপাচার চক্রের বেশ কিছু সদস্যের নাম উঠে এসেছে। তারা স্থানীয় কচ্ছপিয়া ও পাশবর্তী গ্রামের বাসিন্দা। পাচারকারী চক্রটি বিভিন্ন মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় নৌপথে মানবপাচারের জন্য লোক সংগ্রহ করে। সাগরে অপেক্ষমান মানবপাচারের ট্রলারে তুলে দেয়ার আগে কচ্ছপিয়া পাহাড়ের তাদের গোপন আস্তানায় জিম্মি করে। সেখানে দেনদরবার শেষ হলেই উঠিয়ে দেয়া হয় ট্রলারে। মানবপাচারে জড়িত শক্তিশালী চক্রটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া না গেলে কচ্ছপিয়া পাহাড় কেন্দ্রিক মানবপাচার বন্ধ হবেনা বলে ধারণা স্থানীয়দের।
বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া জুম্মা পাড়া এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপি নেতা নসরত আলীর ছেলে আব্দুল আলী মেরিনড্রাইভ কেন্দ্রিক মানবপাচার চক্রের অন্যতম হোতা। বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া বাঘঘোনা নৌঘাট, নোয়াখালীপাড়া নৌঘাট, কচ্ছপিয়া পিনিচভাঙ্গা নৌঘাটের তিনটি পয়েন্ট আবদুলের চক্র মানবপাচারের শীর্ষে রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মানবপাচার, অপহরণ সহ ডজনের বেশি মামলা রয়েছে। গত এপ্রিল মাসে কালের কণ্ঠে ‘টেকনাফ সীমান্তে মানবপাচারের ১৫ চক্র-মাঝি থেকে পাচারকারী আবদুল’ শিরোনামে প্রকাশিত এক সচিত্র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্থানীয় বিএনপি নেতা আবদুল আলীর মানবপাচার ও অপহরণ বাণিজ্য নিয়ে বিস্তারিত ঘটনা ছাপা হয়েছিল। এরপর ২৬ মে টেকনাফ থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। গত কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার মানবপাচারে সক্রিয় হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে তার ছেলে সাইফুল ইসলাম পিতার মানবপাচার কর্মকাণ্ডের অন্যতম সহযোগীর ভূমিকা রাখেন।
মানবপাচার চক্রে আব্দুল আলী ছাড়া যাদের নাম ওঠে এসেছে তারা হচ্ছেন টেকনাফ সদর ইউনিয়নের হাবিরছড়ার রশিদ মেম্বার, কচ্ছপিয়া এলাকার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, রেজাউল করিম, আয়াতুল তনজিদ, মুজিব উল্লাহ, জয়নাল, আব্দুল মজিদ, শাহজাহান, ফেরদৌস, আব্দল গফুর, স্থানীয় মহিলা মেম্বারের স্বামী আব্দুল গফুর, কেফায়েত উল্লাহ, জসিম উদ্দীন, সোলতান আহমদ,জাফর আলম, সৈয়দুল হক, রিদুয়ান, ফারুক ও মো. জুবায়ের। চক্রের এসব সদস্যই বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া পাহাড় কেন্দ্রিক মানবপাচার চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।
ডিবিএন/জেইউ।