মঙ্গলবার ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
আসামির যাবজ্জীবন

দীর্ঘ ২০ বছর পর শিশু রিপা মনি হত্যা মামলার রায়

শফিকুর রহমান   |   সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   22 বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

দীর্ঘ ২০ বছর পর শিশু রিপা মনি হত্যা মামলার রায়

তদন্তের বৈধতা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের কারণে প্রায় ২০ বছর আটকে ছিল কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিএম চর বেতুয়া গ্রামের শিশু রিপা মনি হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম। একের পর এক তদন্ত, পুনঃতদন্ত, চার্জশিট নিয়ে আইনি জটিলতা এবং উচ্চ আদালতে মামলা চলার পর অবশেষে মামলাটির রায় ঘোষণা করেছেন আদালত।

সোমবার (৩১ আগস্ট ২০২৬) কক্সবাজার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক নজরুল ইসলাম মামলার রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে আসামি আব্দুল মান্নানকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দণ্ডবিধির ৩২৪ ধারায় ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
অন্যদিকে মামলার বাকি চার আসামিকে আদালত খালাস দিয়েছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুর রশিদ।

তিনি জানান, মামলায় মোট ২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত ২৫ আগস্ট মামলার যুক্তিতর্ক ও অন্যান্য আইনি কার্যক্রম শেষ করে আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে ৩১ আগস্ট মামলার রায়ের দিন ধার্য করেন আদালত।

যেভাবে ঘটেছিল হত্যাকাণ্ড

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিএম চর বেতুয়া গ্রামে শিশু রিপা মনি হত্যার ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় নিহতের বাবা আবুল বশর চৌকিদার বাদী হয়ে ওইদিনই চকরিয়া থানায় আব্দুল মান্নানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, খাস জমির আইল বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধের জেরে আসামিরা বাদী আবুল বশর ও তার স্ত্রী আয়াতুন্নাহারের ওপর হামলা চালায়। এ সময় শিশু রিপা এগিয়ে এলে তাকে কোদাল দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয় এবং পরে তার মৃত্যু হয়।

মামলার তদন্ত শেষে ২০০২ সালে এজাহারভুক্ত ছয় আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৭/৩২৪/৩৫৪/৩৭৯/৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়।

তবে আদালতে ওই চার্জশিট গ্রহণের আগেই পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য আবেদন করেন। একই বছর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন।

পুনঃতদন্ত শেষে ২০০৪ সালে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা তন্ময় রায় নিহত রিপা মনির মা আয়াতুন্নাহারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় চার্জশিট দাখিল করেন। একই সঙ্গে এজাহারভুক্ত ছয় আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

সিআইডির ওই চার্জশিটে দাবি করা হয়, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে আয়াতুন্নাহার নিজেই তার মেয়ে রিপা মনিকে হত্যা করে এজাহারভুক্ত আসামিদের ওপর দায় চাপিয়েছেন।

২০০৪ সালের ২৯ মার্চ আদালত আয়াতুন্নাহারের বিরুদ্ধে দেওয়া চার্জশিট গ্রহণ করেন এবং এজাহারভুক্ত ছয় আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন।

শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই

আদালতের এই আদেশের বিরুদ্ধে নিহত রিপা মনির বাবা আবুল বশর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা করেন। সেটি নামঞ্জুর হওয়ার পর ২০০৪ সালে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১(ক) ধারায় হাইকোর্টে আবেদন করেন তিনি।

২০১১ সালে রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট আয়াতুন্নাহারের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণের আদেশ বাতিল করে দেন। একই সঙ্গে প্রথম চার্জশিটে থাকা ছয় আসামি ও আয়াতুন্নাহারের বিরুদ্ধে দেওয়া চার্জশিট একত্রে রেখে বিচারকাজ পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেন মামলার বাদী ও আয়াতুন্নাহারের স্বামী আবুল বশর।

২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আয়াতুন্নাহারকে আসামি করে সিআইডির দেওয়া সম্পূরক চার্জশিট অবৈধ ঘোষণা করেন। পাশাপাশি প্রয়োজন মনে করলে ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন বলে পর্যবেক্ষণ দেন।
এরপর ওই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আসামি আব্দুল মান্নান রিভিউ পিটিশন দায়ের করেন। ২০১৬ সালে আপিল বিভাগ সেই রিভিউ পিটিশনও খারিজ করে দেন।

আপিল বিভাগের নির্দেশনার আলোকে কক্সবাজার আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি অধিকতর তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল), চকরিয়াকে নির্দেশ দেন। তদন্ত প্রতিবেদন ২০১৭ সালের ১৪ মার্চের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তবে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের আগেই মামলার বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তার দেওয়া চার্জশিট আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
এই আদেশের বিরুদ্ধে আব্দুল মান্নান জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন করেন।

২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর ওই রিভিশন আবেদন খারিজ করে দেন কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ খোন্দকার হাসান মো. ফিরোজ।

আদালতের আদেশে বলা হয়, সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল), চকরিয়াকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও কোনো অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি। যেহেতু এটি একটি হত্যা মামলা, সেই বিবেচনায় প্রথম চার্জশিট আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা যথাযথ হয়েছে।
এরপর ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন করেন আব্দুল মান্নান।

২০২০ সালের ৪ অক্টোবর বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ভার্চুয়াল ডিভিশন বেঞ্চ আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন।

এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা চার্জশিটের বৈধতা নিয়ে আইনি জটিলতার অবসান ঘটে এবং মামলাটি বিচারিক কার্যক্রমের দিকে এগিয়ে যায়।

দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সোমবার (৩১ আগস্ট ২০২৬) কক্সবাজার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলাটির রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে আব্দুল মান্নানকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দণ্ডবিধির ৩২৪ ধারায় ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার বাকি চার আসামিকে খালাস দেন আদালত।

রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্দুর রশিদ সন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন- দীর্ঘ আইনি জটিলতার পর মামলাটির বিচার শেষ হওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। এই রায়ে আসামিপক্ষের মানুষও খুশি, আমরাও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে খুশি। দীর্ঘদিন পর মামলাটির একটি নিষ্পত্তি হয়েছে।

তবে মামলার বাকি চার আসামি খালাস পাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত শিশু রিপা মনির ভাই।

তিনি বলেন- বাকি চারজনকে আদালত খালাস দিয়েছেন। এতে আমরা অসন্তুষ্ট। যারা খালাস পেয়েছেন, তারাও হত্যার আসামি ছিলেন বলে আমরা মনে করি। তারা খালাস পাওয়ায় আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে, তারা আবারও আমাদের ওপর হামলা করতে পারেন।

প্রায় দুই দশক ধরে চলা আইনি জটিলতা ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে শিশু রিপা মনি হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হলো।

Facebook Comments Box

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

প্রকাশক ও সম্পাদক
তাহা ইয়াহিয়া
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
বিজয় কুমার ধর

যোগাযোগ

প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত

মোবাইল : বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন : 01828090145, 01812586237

ই-মেইল: ajkerdeshbidesh@yahoo.com