| রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | 18 বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ভয়াবহ তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ইউরোপ। গত সাত দিনে মহাদেশজুড়ে অতিরিক্ত ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ফ্রান্সেই তিন দিনের তীব্র গরমে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১ হাজার মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপ এখন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশে পরিণত হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে ইউরোপ। গত ২১ জুনের পর থেকে মহাদেশজুড়ে অতিরিক্ত ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তীব্র গরমে শুধু ফ্রান্সেই মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ হাজার মানুষের। জার্মানিতে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, সড়ক ও রেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো চরম চাপের মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস বলেছেন, বর্তমানে ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশে পরিণত হয়েছে। এখন সেখানে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে মাত্র তিন দিনের তীব্র গরমে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে জার্মানিতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দিনের তাপমাত্রা এবং সবচেয়ে উষ্ণ রাত রেকর্ড করা হয়েছে। গ্রিসে এখনও দাবানলের সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। সুইডেনে বজ্রপাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং কয়েক দিনের রেকর্ড তাপমাত্রার পর ডেনমার্কে তীব্র বজ্রঝড় আঘাত হেনেছে।
টেড্রোস বলেন, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে ইউরোপ। ফলে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ এখন আরও ঘন ঘন এবং আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ হলো ইউরোপ। এটি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। বর্তমানে ১৫ কোটি মানুষ চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে রয়েছেন, শত শত মানুষ মারা গেছেন, স্কুল বন্ধ রয়েছে এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চাপে পড়েছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, একসময় যে ধরনের তাপপ্রবাহকে প্রজন্মে একবার ঘটার মতো বিরল ঘটনা মনে করা হতো, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে এখন তা প্রায় প্রতি বছরই দেখা যাচ্ছে।
টেড্রোস জানান, ২১ জুনের পর থেকে ইউরোপে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে অতিরিক্ত ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তিনি তাপজনিত শারীরিক চাপকে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ইউরোপের অনেক বাড়ি, স্কুল ও কর্মস্থল দীর্ঘ সময়ের চরম গরম মোকাবিলার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ডব্লিউএইচও বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও প্রস্তুতি জোরদারে কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে দেশগুলোকে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ফ্রান্স। দেশটির জনস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সপ্তাহের সবচেয়ে গরম সময়ে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এপ্রিল ও মে মাসে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৯০০ থেকে ১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতো, সেখানে বুধবার তা বেড়ে ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়ে যায়। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৪০০-এরও বেশি হয়।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ওই তিন দিনেই অন্তত ১ হাজার অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত বাসায় হওয়া মৃত্যুর তথ্যসহ আরও প্রতিবেদন পাওয়ার পর এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।
মৃতদের প্রায় ৮৫ শতাংশের বয়স ছিল ৬৫ বছর বা তার বেশি। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সর্বোচ্চ ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি থাকা এলাকায়। তাপপ্রবাহের চূড়ান্ত সময়ে এ সতর্কতা দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকায় কার্যকর ছিল।
এছাড়া সপ্তাহান্তে জার্মানিতেও নজিরবিহীন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, ম্যাকার্ন-ড্রেভিৎসে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং কুবশ্টজে রাতের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই আগের দিন গড়া রেকর্ড ভেঙেছে।
এমন অবস্থায় তীব্র গরমে জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। শনিবার শুধু বার্লিনেই অতিরিক্ত প্রায় ৫০০টি অ্যাম্বুলেন্স কল এসেছে, যার বেশির ভাগই ছিল তাপজনিত অসুস্থতার কারণে।
এমনকি রাজধানী বার্লিনের ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের কাছে জড়ো হওয়া বাসিন্দা ও পর্যটকদের স্বস্তি দিতে পুলিশ জলকামান দিয়ে পানি ছিটিয়েছে। এছাড়া তীব্র গরমে জার্মানির বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় বনাঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে।
তীব্র গরমে সড়ক ও রেল অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি মহাসড়কের কংক্রিটের অংশ ফুলে উঠে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জার্মান রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডয়চে বান যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
হামবুর্গ থেকে প্রাগগামী একটি ট্রেনে ঝড়ের কারণে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এতে ট্রেন থেকে ৬০০-এর বেশি যাত্রীকে সরিয়ে নেয়া হয়। তাপজনিত অসুস্থতায় দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
লাইপজিগে অতিরিক্ত গরমে ট্রামের রেললাইন ও সুইচ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ট্রাম চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
এদিকে তাপপ্রবাহের পর ইউরোপের কয়েকটি দেশে বৈরী আবহাওয়াও দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ সুইডেনের টোসেলিলা সোমারল্যান্ড বিনোদন পার্কে বজ্রপাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন প্রাপ্তবয়স্ককে হাসপাতালে নেয়া হয়। এদের একজন নারী গুরুতর আহত হয়েছেন।
সপ্তাহান্তে নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড গড়ার পর ডেনমার্কে তীব্র বজ্রঝড় আঘাত হেনেছে। এদিকে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া অব্যাহত থাকায় গ্রিসের পাঁচটি অঞ্চলে দাবানলের ‘অত্যন্ত উচ্চ’ ঝুঁকির সতর্কতা জারি রেখেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানীদের মতে রেকর্ড গড়া এই তাপমাত্রা সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। ইউরোপের জলবায়ুবিজ্ঞানীদের সংগঠন ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত জলবায়ু পরিবর্তন না হলে গত সপ্তাহের এ তাপপ্রবাহ কার্যত অসম্ভব ছিল।
গবেষকদের মতে, পাঁচ দশক আগে এত তীব্র তাপপ্রবাহ কল্পনাই করা যেত না। আর ২০ বছর আগের তুলনায় এখন এমন তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা প্রায় ২০০ গুণ বেড়ে গেছে।