বুধবার ১২ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

৪০ বছরের রাজনীতি: অতীতের জবাব ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার

মুক্তমত   |   বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   26 বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

৪০ বছরের রাজনীতি: অতীতের জবাব ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার

রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় উত্থান-পতন, সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রশংসা ও সমালোচনা—সবই থাকে। আমাদের পরিবারেরও প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক পথচলা রয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষের পাশে থাকার যেমন সুযোগ হয়েছে, তেমনি নানা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে।

আজকের এই লেখা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে বিতর্কে জড়ানোর জন্য নয়। বরং আমার পরিবার, আমার অতীত, আমাদের রাজনৈতিক পথচলা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে যে প্রশ্ন ও আলোচনা রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে আমার অবস্থান পরিষ্কার করাই এর উদ্দেশ্য।

ইতিহাস নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু ইতিহাসকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমার বিশ্বাস—আবেগ, গুজব কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে তথ্য, নথি ও আইনি প্রক্রিয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

অতীতের একটি কঠিন অধ্যায়

আমার জীবনের একটি কঠিন অধ্যায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন রয়েছে। আমি সেই প্রশ্ন থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করিনি। বরং আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করেছি এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছি।

আমাদের প্রায় ২২ মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে। এরপর তদন্ত, যাচাই-বাছাই এবং আদালতের আইনি প্রক্রিয়া চলেছে। যেসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি, সেসব মামলায় আমরা আইনগতভাবে খালাস পেয়েছি—এটাই সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফল।

এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের অত্যন্ত কঠিন সময় ছিল। তবে আমি মনে করি, কঠিন সময় মানুষকে নিজের জীবন, সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগও দেয়।
আমি আমার জীবনের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আল্লাহর কাছে তওবা করেছি এবং নিজের ভবিষ্যৎ পথচলা আরও দায়িত্বশীল করার প্রত্যয় নিয়েছি।

তাই আমার অতীত নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু আমার অনুরোধ, আমাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, কমেন্ট কিংবা গুজবের ভিত্তিতে নয়—প্রমাণ, নথি ও আইনের আলোকে মূল্যায়ন করা হোক।

মাদক সমস্যা: ব্যক্তি নয়, বাস্তবতার আলোকে আলোচনা প্রয়োজন

টেকনাফ ও উখিয়ার সঙ্গে মাদক পাচারের বিষয়টি বহু বছর ধরে আলোচিত একটি জাতীয় সমস্যা। এই সমস্যাকে কেবল একজন ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে এর প্রকৃত চিত্র হয়তো পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

The Daily Star-এর ২৭ অক্টোবর ২০০৭ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে অল্প পরিমাণে থাইল্যান্ড থেকে ইয়াবা বাংলাদেশে আসত এবং ২০০০ সাল থেকে মিয়ানমার হয়ে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বড় পরিমাণে ইয়াবা প্রবেশ শুরু করে।

এই তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইয়াবার বড় আকারের প্রবেশের ইতিহাস এমন একটি সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, যখন আমার ভাই আব্দুর রহমান বদি এখনও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি।

এই প্রসঙ্গটি আমি কাউকে দায়মুক্তি দেওয়ার জন্য তুলছি না। বরং একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনতে চাই—মাদক পাচারের মতো দীর্ঘদিনের একটি আন্তঃসীমান্ত অপরাধকে কি কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ব্যাখ্যা করা যায়?
আমার ভাই ২০০৯ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত নানা অভিযোগ ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের; কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার নয়।

একইভাবে, আজ তিনি সংসদ সদস্য নন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে আছেন—এমন পরিস্থিতিতেও যদি মাদক পাচারের সমস্যা থেকে যায়, তাহলে বিষয়টিকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখা প্রয়োজন।

কারণ মাদক পাচার কোনো একক ব্যক্তির কারণে সৃষ্টি হওয়া সমস্যা নয়। এর সঙ্গে সীমান্ত, চোরাচালান, অর্থনৈতিক স্বার্থ, অপরাধী নেটওয়ার্ক, পরিবহনব্যবস্থা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্বলতা জড়িত থাকতে পারে।

সুতরাং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে হলে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ।
একই মাপকাঠি সবার জন্য

রাজনীতিতে একটি বিষয় আমাকে সবসময় ভাবায়—একই অভিযোগের ক্ষেত্রে কি আমরা সবার জন্য একই মাপকাঠি প্রয়োগ করছি?

কেউ জনপ্রতিনিধি হলেই তিনি অপরাধী হয়ে যান না। আবার জনপ্রতিনিধি হলেই কোনো অভিযোগ তদন্তের বাইরে থাকার সুযোগও নেই।

বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফের জনপ্রতিনিধি হিসেবে শাহজাহান চৌধুরী দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁকে শুধু জনপ্রতিনিধি হওয়ার কারণে কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা যেমন ন্যায়সংগত হবে না, তেমনি আমার ভাইকেও শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো অপরাধের জন্য দায়ী করে দেওয়াও ন্যায়সংগত নয়।

অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে তা আদালতে উপস্থাপন করা হবে। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে।

এই নীতিই সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার জন্য কাউকে বছরের পর বছর একটি বিশেষ অপবাদে চিহ্নিত করা কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।

মাদকবিরোধী লড়াই হতে হবে বাস্তব ও প্রাতিষ্ঠানিক
মাদক একটি ভয়াবহ সামাজিক ও জাতীয় সমস্যা। এর কারণে পরিবার ভাঙে, তরুণ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অপরাধের বিস্তার ঘটে।

তাই মাদকবিরোধী লড়াইকে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে হবে। চোরাচালানের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে হবে। অর্থের উৎস ও পাচারের পথ অনুসন্ধান করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণই হতে হবে প্রধান ভিত্তি।
আমার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ নিয়েও আমার অবস্থান পরিষ্কার।

আমার বিরুদ্ধে যারা কথা বলেন, তাদের প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ নেই। বরং আমি মনে করি, একজন রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করার অধিকার মানুষের রয়েছে।

আমি আত্মসমর্পণ করেছি, কারাগারে থেকেছি, তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছি। যেসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, সেসব মামলায় আদালতের মাধ্যমে খালাস পেয়েছি।
বর্তমানে আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা ছাড়া অন্য কোনো মামলা নেই—এটি আমার বক্তব্য। কারও কাছে এর বিপরীত কোনো তথ্য বা নথি থাকলে আমি অনুরোধ করব, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার না করে সংশ্লিষ্ট আইনগত কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হোক।

আমি কোনো অভিযোগ থেকে পালাতে চাই না। একই সঙ্গে প্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নেওয়াও সম্ভব নয়।

অতীত থেকে শিক্ষা, ভবিষ্যতের দিকে তাকানো
আমাদের পরিবারের প্রায় ৪০ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস আমার কাছে শুধু একটি পরিচয় নয়; এটি একটি দায়িত্বও।
আমি জানি, আমার অতীত নিয়ে আলোচনা হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সমালোচনা করবেন। আমার ভুল ও দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

এসব থেকে আমি পালাতে চাই না।
বরং আমার বিশ্বাস, একজন মানুষকে তার অতীত দিয়ে প্রশ্ন করা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি তার পরিবর্তনের চেষ্টা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনাকেও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

আমি আগামীতে টেকনাফ পৌরসভার মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা রাখি। এটি আমার একটি রাজনৈতিক অভিপ্রায়। তবে কোনো নির্বাচনে জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

আমি ক্ষমতার চেয়ারকে লক্ষ্য হিসেবে দেখি না; বরং জনপ্রতিনিধিত্বকে দায়িত্ব হিসেবে দেখতে চাই।
টেকনাফ পৌরসভায় নাগরিক সেবা উন্নত করা, পরিচ্ছন্নতা ও জনসেবার মান বাড়ানো, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া—এসবই আমার রাজনৈতিক ভাবনার অংশ।

আমি বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতে চাই না। কাজের মাধ্যমে আস্থা অর্জন করতে চাই।

শেষ সিদ্ধান্ত জনগণের

আমি চাই, মানুষ আমার অতীত জানুক। আমার ভুল জানুক। আমার কঠিন সময়ের কথাও জানুক।
তারপরও যদি কেউ মনে করেন, আমাকে জনসেবার আরেকটি সুযোগ দেওয়া যেতে পারে—সেটি হবে জনগণের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।

আবার কেউ যদি মনে করেন আমি সেই দায়িত্বের যোগ্য নই, সেটিও তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার।
কারণ একটি নির্বাচনে শেষ কথা কোনো ব্যক্তি, কোনো পরিবার কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের নয়—শেষ কথা জনগণের।

তাই আমার বিরুদ্ধে কথা বলুন, কিন্তু প্রমাণ নিয়ে কথা বলুন।
আমার অতীত নিয়ে প্রশ্ন করুন, কিন্তু তথ্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন করুন।

আমার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত দিন, কিন্তু আমার কাজ, যোগ্যতা, সততা ও জনসেবার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রাখুন।

গুজব দিয়ে নয়—প্রমাণ দিয়ে বিচার করুন।
অপপ্রচার দিয়ে নয়—তথ্য দিয়ে বিচার করুন।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দিয়ে নয়—ন্যায়বিচারের মাপকাঠিতে বিচার করুন।

কারণ শেষ কথা ফেসবুক বলে না।
শেষ কথা কমেন্টবক্সও বলে না।
শেষ কথা রাজনৈতিক স্লোগানও বলে না।
শেষ কথা বলে—প্রমাণ, তদন্ত, আদালত ও আইন।
আর আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে শেষ কথা বলবে—টেকনাফ পৌরবাসী।

অতীত আমার শিক্ষা।
বর্তমান আমার জবাব।
ভবিষ্যৎ জনগণের হাতে।

আব্দুস শুক্কুর
টেকনাফ

Facebook Comments Box

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

প্রকাশক ও সম্পাদক
তাহা ইয়াহিয়া
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
বিজয় কুমার ধর

যোগাযোগ

প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত

মোবাইল : বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন : 01828090145, 01812586237

ই-মেইল: ajkerdeshbidesh@yahoo.com